
নিজস্ব প্রতিবেদক, তানোর : রাজশাহী–১ (তানোর–গোদাগাড়ী) আসনে দলীয় নির্দেশনা অমান্য করে জোটের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করা তিন প্রার্থী ভোটের এক–অষ্টমাংশও না পাওয়ায় তাঁদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। নির্বাচনী বিধান অনুযায়ী প্রার্থীদের জমা দেওয়া ৫০ হাজার টাকা করে ফেরত দেওয়া হবে না।
জামানত হারানো প্রার্থীরা হলেন, গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকের মীর মোহাম্মদ শাহজাহান (৪০৭ ভোট), আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)–এর ঈগল প্রতীকের মো. আব্দুর রহমান (১,১০০ ভোট) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ আল-সাআদ (মোবাইল ফোন প্রতীক, ৬৬৩ ভোট)।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জোটের বাইরে প্রার্থী হওয়ায় তাঁরা পর্যাপ্ত সাংগঠনিক সমর্থন পাননি। মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান প্রচারণা, কেন্দ্রভিত্তিক এজেন্ট ও শক্তিশালী তৃণমূল সংগঠন না থাকায় ভোটের ফলাফলে এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ১ লাখ ৭১ হাজার ৭৮৬ ভোট পেয়ে ১ হাজার ৮৮৪ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন। তাঁর প্রাপ্ত পোস্টাল ভোট ২,০০২টি। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মো. শরিফ উদ্দিন পেয়েছেন ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ ভোট; তাঁর পোস্টাল ভোট ছিল ৮৯২টি।
নির্বাচনের ফলাফল ইতোমধ্যে নির্বাচিত প্রার্থীর নামে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। ভোটগ্রহণের তিনদিন পার হলেও এলাকায় বড় কোনো ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
ভোটের দিন আসনের ১৫৯টি কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা আফিয়া আখতার জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারির কারণে বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও তানোরের ইউএনও নাঈমা খান বলেন, “ভোট গ্রহণ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়েছে।”
এদিকে ফলাফল নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ভোট পুনর্গণনার আবেদন করেছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মো. শরিফ উদ্দিন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ৩৭ ধারা অনুযায়ী গত ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে তিনি জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন দাখিল করেন। আবেদনে ভোট গ্রহণ ও গণনার বিভিন্ন ধাপে ভোট ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা আফিয়া আখতার জানান, প্রার্থীর আবেদনটি প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। নির্দেশনা পাওয়া সাপেক্ষে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভোট পুনর্গণনা হবে কি না, তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
ফলাফল ঘোষণার পর বিজয়ী প্রার্থীর সমর্থকরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ প্রায় চার দশক পর রাজশাহী–১ আসন পুনরুদ্ধার হয়েছে। স্থানীয় যুব নেতা মোহাম্মদ আতিকুর রহমান বলেন, “তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন শক্তিশালী করা, ধারাবাহিক জনসংযোগ এবং তরুণ ভোটারদের সমর্থনই এই জয় নিশ্চিত করেছে।”
স্থানীয় আদিবাসী সমাজের প্রতিনিধি নরেস হেমব্রম বলেন, “আমরা এমন একজন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছি, যিনি গ্রামের মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন।” হিন্দু তরুণ ভোটার হৃদয় কুমার বলেন, “আমরা এ অঞ্চলের সব মানুষের সমান অধিকার চাই। মুজিবুর রহমান আমাদের সেই বিশ্বাস অর্জন করেছেন।”
সাধারণ ভোটারদের মতে, এবারের নির্বাচনে মূল লড়াই ছিল দুই বড় দলের মধ্যে। ছোট দলগুলোর প্রচারণা তেমন চোখে পড়েনি। তাঁদের ভাষ্য, জোটভিত্তিক ও শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো ছাড়া নির্বাচনী রাজনীতিতে টিকে থাকা কঠিন।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মিজানুর রহমান,
বার্তা সম্পাদক : সৈয়দ মাহমুদ
©স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৫ রাজশাহী ট্রিবিউন ২৪