
নিজস্ব প্রতিবেদক, তানোর : রাজশাহীর তানোর উপজেলার মোহর গ্রামের প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের পুরোনো একটি তেঁতুলগাছ বৃহস্পতিবার হয়ে উঠেছিল প্রাণবৈচিত্র্য ও পরিবেশ সচেতনতার এক প্রতীক। আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য দিবস উপলক্ষে গাছটির নিচে আয়োজন করা হয় ব্যতিক্রমধর্মী কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য উৎসবের।
‘একটি গাছ, একটি বাস্তুসংস্থান’ প্রতিপাদ্যে এ উৎসবের আয়োজন করে তানোর উপজেলা জনসংগঠন সমন্বয় কমিটি, গ্রীণ কোয়ালিশন এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক)।
উৎসবস্থলে তেঁতুলগাছটির গায়ে ঝুলিয়ে রাখা হয় নদী, পাখি, মাটি, কেঁচো ও বাস্তুতন্ত্রের বিভিন্ন উপাদানের বার্তাসংবলিত প্ল্যাকার্ড। কোথাও লেখা ছিল ‘গাছ আমার নিরাপদ আশ্রয়’, আবার কোথাও ‘মাটিকে উর্বর রাখি আমি’। এসব উপস্থাপনার মাধ্যমে প্রকৃতি, মানুষ ও জীববৈচিত্র্যের পারস্পরিক নির্ভরতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
আয়োজকেরা জানান, দেশীয় প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করাই ছিল এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। একটি গাছকে কেন্দ্র করে পাখি, মৌমাছি, কাঠবিড়ালি, অণুজীবসহ অসংখ্য প্রাণের বসবাস গড়ে ওঠে। একটি গাছ শুধু ছায়া দেয় না, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তুতন্ত্র হিসেবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে—উৎসবের মাধ্যমে সেই বার্তাই তুলে ধরা হয়েছে।
উৎসবে ১৪০ প্রজাতির ধান, গম ও সবজির বীজ প্রদর্শনের পাশাপাশি ছিল ৪৫ প্রজাতির অচাষকৃত শাকসবজি, বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন নদীর পানি ও মাটিবৈচিত্র্য, শাপলা, শালুক, শামুক-ঝিনুকসহ জলজ বাস্তুতন্ত্রের নানা উপাদান। পরিবেশবান্ধব চুলা ও দেশীয় মাছ ধরার সরঞ্জামও প্রদর্শন করা হয়। অংশগ্রহণকারী কৃষক-কৃষাণিরা নিজেদের মধ্যে দেশীয় বীজ বিনিময় করেন।
বারসিকের প্রোগ্রাম অফিসার অমৃত সরকারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান বলেন, প্রাণবৈচিত্র্য শুধু বন বা বন্যপ্রাণীর বিষয় নয়; এটি খাদ্য, কৃষি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। প্রকৃতিনির্ভর অর্থনীতি এখন বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই জৈবিক সম্পদ রক্ষা ও পুনরুদ্ধারে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক)-এর গবেষক ও বরেন্দ্র অঞ্চলের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী শহিদুল ইসলাম বলেন, “প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা ছাড়া টেকসই কৃষি ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ কল্পনা করা যায় না। স্থানীয় বীজ, মাটি, জলজ প্রাণী ও দেশীয় খাদ্যসংস্কৃতি সংরক্ষণ করতে না পারলে পরিবেশগত ভারসাম্য আরও হুমকির মুখে পড়বে। তাই মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের শিক্ষা ফিরিয়ে আনতে হবে।”
উৎসবে উপজেলার ১০টি গ্রামের কৃষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও তরুণ সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন তানোর উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ সম্পাদক আক্কাস আলীসহ বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
বরেন্দ্র বীজ ব্যাংকের সভাপতি জায়দুর রহমান বলেন, দেশীয় ধানের জাত সংরক্ষণের জন্য তিনি প্রতিবছর প্রায় ১৭০ জাতের ধান চাষ করেন এবং কৃষকদের মধ্যে বিনিময় করেন। তাঁর ভাষায়, “দেশীয় ধানের জাত হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিও।”
উপজেলার জগদীশপুর গ্রামের কিষানি সেতারা বেগম বলেন, একসময় গ্রামে প্রচুর অচাষকৃত শাক পাওয়া যেত, যা এখন প্রায় বিলুপ্ত। তাই তিনি নিজের বাড়িতে ৩০ প্রজাতির অচাষকৃত শাক সংরক্ষণ ও চাষ করছেন।
মুন্ডুমালা গ্রামের কিষানি মিস মনিকা টুডু বলেন, শামুক, ঝিনুকসহ অনেক জলজ প্রাণী বিলুপ্তির পথে। এ কারণে তিনি একটি পুকুরে জলজ প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণে কাজ করছেন।
গোল্লাপাড়া গ্রামের স্বশিক্ষিত কৃষিবিজ্ঞানী নূর মোহাম্মদ বলেন, অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহারে বিলকুমারী বিলসহ বিভিন্ন জলাভূমির প্রাণবৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে গ্রীণ কোয়ালিশনের মাধ্যমে বিভিন্ন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।#
সম্পাদক ও প্রকাশক : মিজানুর রহমান,
বার্তা সম্পাদক : সৈয়দ মাহমুদ
©স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৫ রাজশাহী ট্রিবিউন ২৪